সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫১ অপরাহ্ন

ইসি ও সরকারের সমন্বয়হীনতায় জুলাই অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট হুমকিতে: টিআইবি

আরব-বাংলা রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ৮:২০ am

জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের যে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, আইনি অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক চাপ—এমন মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির আশঙ্কা, এসব কারণে ঐতিহাসিক এই প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও গণম্যান্ডেট মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত, আইনগত ব্যাখ্যার বিভ্রান্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব জনমনে প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামানের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। রাজনৈতিক চাপের মুখে কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছে না। অনলাইন ও মাঠপর্যায়ে আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন ঘটলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে নিষ্ক্রিয় থাকছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহকারীদের হয়রানি ও হুমকির ঘটনাকেও তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।

অনলাইন অপপ্রচার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
ডিজিটাল মাধ্যমে অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তার মতে, গুগল ও মেটার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট দমনে পর্যাপ্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছে না।

তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়নের সুযোগও নষ্ট করছে।

গণভোটে সরকারের অবস্থান ও আইনি জটিলতা
গণভোট ইস্যুতে সরকারের দোদুল্যমান অবস্থানেরও কঠোর সমালোচনা করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি। উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা গণভোটের উদ্দেশ্য ও প্রশ্নকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে।

একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, সবচেয়ে বড় আইনি বিভ্রান্তি হলো—নির্বাচন কমিশন গণভোটকে নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করছে, অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী গণভোট কোনোভাবেই নির্বাচনের সমার্থক নয়।

সরকারি কর্মচারী ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
তফসিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা আইনত নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও সরকার তাদের গণভোটের পক্ষে প্রচারে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইসির সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল, যা করা হয়নি।

এছাড়া ব্যাংক, এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, গণভোটে অর্থায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষায়, নির্বাচন কমিশন আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করেছে।

জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারে টিআইবির প্রস্তাব
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণভোটের ভিত্তি হওয়া উচিত জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উৎসারিত ‘জুলাই সনদ’। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি।

টিআইবির প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ক্ষমতার অপব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া, সংসদে নারী আসন ১০০-তে উন্নীত করা এবং কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করা।

এছাড়া ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে অর্থবিল ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ, ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের সদস্য নিয়োগের দাবিও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের শেষে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি দেশবাসীর প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘না’ এবং জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানান।

শেয়ার করুন

  • Facebook
  • Twitter
  • Digg
  • Linkedin
  • Reddit
  • Google Plus
  • Pinterest
  • Print
আরো
© All rights reserved © arabbanglatv

Developer Design Host BD