দীর্ঘ কয়েক বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাইরে থাকার পর এবার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের পর তৃণমূলে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছে বিএনপির হাইকমান্ড। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী নির্দেশনায় দল এখন অনেক বেশি সংঘবদ্ধ ও গতিশীল। বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে যে প্রহসন ও ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ভোটের মাঠে নামার আগেই দলটির সামনে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সাংগঠনিক সংকট। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান পদে বিএনপির ৭ থেকে ১২ জন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন, যা দলটির জন্য একটি বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃণমূলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা সত্ত্বেও বিএনপির রাজনীতিতে নেতাকর্মীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ কমেনি। বরং প্রতিটি এলাকায় দলের দুর্দিনের পরীক্ষিত কর্মীরা নিজেদের এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। এর ফলে একটিমাত্র ইউপি চেয়ারম্যান পদের বিপরীতে একাধিক যোগ্য ও প্রভাবশালী নেতা দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। কোথাও কোথাও এই সংখ্যা এক ডজনও ছাড়িয়ে গেছে। এত অধিক সংখ্যক প্রার্থী মাঠে থাকায় দলের ভেতরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিভক্তির আশঙ্কাও করছেন অনেকে। দীর্ঘদিন ধরে হামলা, মামলা ও নিপীড়নের শিকার হওয়া কার্যকরভাবে মোকাবেলা করে বিএনপি এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও এই অতি-আগ্রহ দলটির জন্য এক ধরনের জটিলতা তৈরি করেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নির্বাচনে দলের নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন থেকেই নড়েচড়ে বসেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক শুরু হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারক মহল মনে করছে, উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা হবে। অন্যথায় একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভোটের বাক্সে। বিগত দিনে ফ্যাসিস্ট সরকারের নানা দমনপীড়নের মধ্যেও যেসব নেতা দলের আদর্শ বিসর্জন দেননি, তাদের মধ্য থেকেই ত্যাগ ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির এই ফেরা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে যখন কার্যত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও তাদের অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক মাঠ থেকে বিতাড়িত, তখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির শক্তিশালী উপস্থিতি দেশের গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করবে। তবে একক প্রার্থী বাছাইয়ের এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে পার করতে পারলে বিএনপি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
আরববাংলা টিভি/ডেস্ক