শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪৯ অপরাহ্ন

জ্বালানি সংকট এক মাসে সমাধান হওয়ার নয়: অর্থমন্ত্রী

আরব-বাংলা রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬ ২:৫৮ pm

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘এনার্জি সিকিউরিটি ইজ দ্য প্রাইমারি কম্পোনেন্ট ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব দ্য ইকোনমি।’ তবে এ সমস্যা এক মাসে সমাধান হওয়ার নয়। সরকার যে পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, সেখান থেকে দ্রুততম সময়ে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য এনার্জি সিকিউরিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার প্রত্যেকটি এনার্জি সেক্টরে তিন মাসের রিজার্ভ নিশ্চিতে কাজ করছে।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের কোনো কোনো এনার্জি খাতে ১৫ দিন বা ১৭ দিনের রিজার্ভও ছিল না। বর্তমানে সেই রিজার্ভ এক মাসে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। এখন এটিকে তিন মাসে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আমির খসরু বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট সমাধানে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় এফএসআরইউ নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে অনশোরভিত্তিক গ্যাসের উৎস ও পাইপলাইন নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি এনার্জি সেক্টরে তিন মাসের রিজার্ভ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। দেশে বিনিয়োগ না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও তৈরি হবে না।

তিনি বলেন, বিগত দিনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর ছিল। বিএনপির মৌলিক দর্শন হচ্ছে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি। বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি পরিচালনা করবে এবং সরকারের দায়িত্ব হবে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা, সহায়তা ও সুবিধা দেওয়া।

‘এই কাজটি আমরা আপনাদের সবাইকে নিয়ে করার চেষ্টা করছি। পুরো বিষয়টাই আসলে বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিনিয়োগ ছাড়া এখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই,’—বলেন তিনি।

ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ডিরেগুলেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করে আমির খসরু বলেন, শুধু নীতিমালা ঘোষণা করলেই হবে না, এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ডিরেগুলেশনের বিষয়গুলো সামনে আনতে সরকার কাজ করছে এবং ব্যবসায়ীরা কোথাও বাধাগ্রস্ত হলে তা জানানোর জন্য একটি ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও তাদের সদস্যদের সমস্যার বিষয়ে অবস্থান নিতে হবে।

কাস্টমস, বন্দর ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে ব্যবসার খরচ কমানোর বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, একটি বৈঠকেই প্রায় ৮ থেকে ১০টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পণ্য আমদানির পর কার্গো ছাড় করতে কত সময় লাগবে, কাস্টমস ও বন্দর কোন কাজ কত দিনের মধ্যে শেষ করবে; এসব বিষয়ে সময়সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ব্যবসায়ীদের খেলাপি ঋণের সমস্যা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ পুনঃতফসিল ও ওয়ান-টাইম সেটেলমেন্টের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, যারা ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সময় ও গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর যারা ব্যবসা থেকে বের হয়ে যেতে চান, তারা ওয়ান-টাইম সেটেলমেন্টের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে পারবেন।

আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এ প্যাকেজ কার্যকর হবে জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তারা কোনো ব্যাংকে বাধাগ্রস্ত হলে সরকারকে জানাতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে এমন অর্থ দেখিয়ে লাভ নেই, যা বাস্তবে আর কখনো ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ ধরনের সম্পদ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট পরিষ্কার করা এবং ব্যবসায়ীদের নতুন করে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, আর্থিক খাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখা হবে না। যোগ্যতা ও নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারীদেরই সুবিধা দেওয়া হবে।

‘আমরা ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেবো না। যেখানে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরের সেনসিটিভিটি থাকবে, সেখানে রাজনীতি আসতে পারে না। এটা মার্কেট, আপনাকে মার্কেটকে সম্মান করতে হবে,’—বলেন তিনি।

কুটির শিল্প ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে মূলধারায় আনার উদ্যোগ

কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির মূলধারায় আনতে সরকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গ্রামের কামার-কুমার, তাঁতি, শীতলপাটি, শতরঞ্জি, নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের এতদিন অর্থনীতির মূলধারায় পর্যাপ্তভাবে আনা যায়নি।

এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তা দেওয়া হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সুযোগ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

স্পোর্টস ও বিনোদন খাতকে অর্থনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন আমির খসরু। তিনি বলেন, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, সংগীত ও খেলাধুলার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। এসব খাত থেকে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও এতদিন এগুলোকে অর্থনীতির মূলধারায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

লন্ডনের থিয়েটার ডিস্ট্রিক্টের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি থিয়েটারকে কেন্দ্র করে টিকিট বিক্রি, দোকান, রেস্টুরেন্ট, আইনগত সেবা, ডিজাইনার শপ ও আর্ট গ্যালারিসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে। একইভাবে বাংলাদেশেও থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করা সম্ভব।

‘এগুলোও জিডিপির অংশ। আমরা এগুলোকে কোনো সময় মনিটাইজ করিনি। এখন এই জায়গাগুলোতে বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে চাই,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যেসব মানুষ প্রচলিত অর্থনীতিতে মূলধন বা ঋণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত, নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সেমিনারের শুরুতে অতিথিদের আগমন ও নিবন্ধনের পর পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা হয়। এরপর ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক এবং সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান।

সেমিনারে ২০২৬ অর্থবছরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির প্রভাব, দেশের বেসরকারি খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতামত উঠে আসে।

শেয়ার করুন

  • Facebook
  • Twitter
  • Digg
  • Linkedin
  • Reddit
  • Google Plus
  • Pinterest
  • Print
আরো
© All rights reserved © arabbanglatv

Developer Design Host BD