রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৪:৫৫ অপরাহ্ন

মারামারির ঘটনায় সিংগাইর থানার ওসির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা নেওয়ার অভিযোগ

আরব-বাংলা রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ৮:৩১ am

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: পাওনা টাকা চাওয়া নিয়ে মারামারি ঘটনায় মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জে,ও,এম তৌফিক আজমের বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীসহ তার লোকজনের নামে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা নথিভুক্ত করে হয়রানীর অভিযোগ উঠেছে। সেই সঙ্গে তাকেসহ দু’জনকে গ্রেফতারও করা হয়। ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ীর নাম সেলিম হোসেন। সে উপজেলার বাইমাইল গ্রামের মো: নুর ইসলামের ছেলে। সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়ে ওসির বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পুলিশ প্রধানসহ পুলিশের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে সেলিমের অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন ওসি তৌফিক আজম।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সেলিম হোসেনের ব্যবসায়িক অংশীদার সৈয়দ আবু সুফিয়ান ফয়সাল। তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরে বাসিন্দা হলেও তাঁর পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানার শাজাবাজপুর গ্রামে। তাঁরা দু’জন যৌথ ভাবে ১০ বছর ধরে সিংগাইরে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করে আসছে। ব্যবসা কেন্দ্রিক লেনদেনের একটি পর্যায়ে আবু সুফিয়ানের নিকট ১৪ কোটি টাকা পাওনা হয় সেলিম। এনিয়ে দুজনের মধ্যে একাধিকবার দেনদরবারও হয়। দেনদরবারে টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দেয়নি আবু সুফিয়ান। টাকা চাইলেই পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও গাইবান্ধা-৫ আসনের এমপি মাহমুদ হাসান রিপনের পরিচয় দিয়ে সেলিমকে হুমকি ধমকি দিতেন তিনি। উপায়ন্তর না পেয়ে টাকার দাবিতে আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে সিংগাইর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন সেলিম। এপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সিংগাইর থানার তৎকালিন ওসি মো: জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীরের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষকের মধ্যে সালিসি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে বিষয়টি মিমাংসা হয়। উভয় পক্ষ লিখিত আপোষ নামায় স্বাক্ষরও করেন। সিদ্ধান্ত হয় দুই কিস্তিতে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা সেলিমকে দিবে আবু সুফিয়ান। আর বাকি টাকার পরিবর্তে তার নামে থাকা ১৭১ শতাংশ জমি সেলিমকে রেজিস্ট্রি করে দিবেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে টাকা ও জমি রেজিস্ট্রি করে না দেওয়ায় মানিকগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন সেলিম। বর্তমান মামলাটি তদন্ত করছেন থানার এসআই রেজাউল করিম। মামলা করায় সেলিমের উপর আরও ক্ষিপ্ত হন আবু সুফিয়ান। গত ২৩ আগষ্ট দুপুরে সিংগাইর বাস্ট্যান্ড এলাকায় সেলিমের অফিসে এসে মামলা প্রত্যাহার করতে চাঁপ দেন তিনি। মামলা প্রত্যাহার না করলে সেলিমকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এঘটনার পরপরই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আপেল মাহমুদ অফিসে এসে সেলিমকে বলে এখনই থানায় যেতে হবে ওসি আপনার সাথে কথা বলবেন। থানায় গেলে সেলিমকে আটক ও তার সাথে খারাপ আচরণ করেন ওসি। পরে বিষয়টি মিমাংসার জন্য ওসি তার অফিস কক্ষে উভয় পক্ষের লোকজন নিয়ে বৈঠক করেন। এক পর্যায়ে ওসি জানান বিষয়টি পুলিশ সুপার ও ডিআইজিসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে গেছে তাই মিমাংসা করা সম্ভব না। উপর মহলের চাপে মামলা নিলেও যে ঘটনা ঘটেছে সেই ঘটনার উপর ভিত্তি করে মামলা নিবো। পরে সেলিম আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সেটা আমলে নিয়ে তাকেও আটক করবো। সেলিম অভিযোগ করলেও রহস্যজনক কারণে তা আমলে নেওয়া হয়নি। উল্টো আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ওসি গভীর রাতে সেলিম ও তার ছেলে পলাশসহ অজ্ঞাত ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা নথিভুক্ত করেন।
সিংগাইর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেওয়ান জাহিনুর রহমান সৌরভ বলেন, আবু সুফিয়ান ও সেলিম হোসেনের মধ্যে লেনদেন নিয়ে মারামারি হয়। ঘটনাটি মিমাংসার লক্ষ্যে ওসির অফিস কক্ষে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়। এক পর্যায়ে আবু সুফিয়ান আপোষ করতে রাজি হয়। কিন্তু ওসির কঠোর মনোভাব ও অসহযোগীতার কারণে আপোষ হয়নি। ওসি আমাদের বলেন, সেলিমকে তো এখন ছাড়া যাবেনা। যে ঘটনা ঘটেছে সেই ঘটনার উপর ভিত্তি করে তার বিরুদ্ধে মারামারির মামলা নেওয়া হবে। সকালে এজহার পরে দেখি চাঁদাবাজি মামলা হয়েছে। অথচ মামলার বাদি আবু সুফিয়ান কখনো একটি বারের জন্যও চাঁদাবাজির কথা মুখে উচ্চারণ করেনি। এমনকি ওসি নিজেও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেনি। কার ইন্ধনে কি উদ্দেশ্য ওসি চাঁদাবাজি মামলা নিলেন তা বুঝে আসছেনা। ঘটনার কয়েকদিন পর ওসি আমাকে ফোন করে বলেন সেলিমকে নিয়ে থানায় আসেন বিষয়টি সমোঝোতা করে দেই। এই ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। তা না হলে অনেক নিরাপরাধ মানুষ মিথ্যা মামলার শিকার হবে।
ব্যবসায়ী সেলিম হোসেন বলেন, আমি কি ভারসাম্যহীন মানসিক রোগী। যার নিকট ১৪ কোটি টাকা পাই তার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা চাবো। ওসি তৌফিক আজম মোটা অংকের টাকা নিয়ে ছেলেসহ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা নিয়েছেন। এতে আমার ভাবমুর্তি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পুলিশেরও সুনাম ক্ষুন্ন হয়েছে। এবিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি), ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার ও মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবে লিখিত অভিযোগ করেছি। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ওসির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে মামলার বাদী আবু সুফিয়ান বলেন, সেলিমের সাথে ২০১৬ সাল থেকে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করছি। এই সুবাধে তার সাথে আমার অনেক টাকা লেনদেন হয়। লেনদেনকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। সেলিমের অভিযোগের ভিত্তিতে সিংগাইর থানার সাবেক ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীরের মধ্যস্থতায় সালিসি বৈঠক হয়। সেখানে জোড় করে একটি কাগজে আমার স্বাক্ষর নেন সেলিম। ওই কাগজে সেলিমকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও ১৭১ শতাংশ জমি ফেরত দেওয়ার কথা লেখা ছিল। এছাড়া গত ২৩ আগষ্ট সিংগাইর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আমার গাড়ির গতিরোধ করে ২০ লাখ টাকা চাঁদা চান সেলিম। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে মারধর করে আমার হাতে থাকা ২৫ লাখ টাকা মুল্যমানের রোলেক্স ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া তাকে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দেই।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জে,ও, এম তৌফিক আজম বলেন, আইনত যেকোনো ব্যক্তি যে কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। মামলা করার অধিকার সবার রয়েেছ। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ায় আবু সুফিয়ানের চাঁদাবাজির অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। মামলা থেকে বাঁচতে সেলিম আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। যা সত্য নয়। ১৪ কোটি টাকার দাবিতে আদালতে সেলিমের করা মামলাটি তদন্তাধীন। তাছাড়া থানার সাবেক ওসির মধ্যস্থতায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও ১৭১ শতাংস জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার শর্তে বিষয়টি মিমাংসাও হয়। এক্ষেত্রে সেলিমের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি বিশ্বাস যোগ্য কি না, এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, গুরুত্বসহকারে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে চাঁদাবাজির ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হলে মামলার চুড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে।

শেয়ার করুন

আরো
© All rights reserved © arabbanglatv

Developer Design Host BD