বাংলাদেশের ই-পাসপোর্টে আবারও যুক্ত হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধ। একই সঙ্গে পাসপোর্টের ভেতরের জলছাপ ও প্রতীকী নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত বা নান্দনিক নয়; বরং রাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক দর্শন ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকী পুনর্বিন্যাস হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশি পাসপোর্টে একসময় স্পষ্টভাবে লেখা থাকত- ‘এই পাসপোর্ট বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ, ইসরায়েল ছাড়া।’ তবে ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ই-পাসপোর্ট চালুর পর সেই শব্দবন্ধ সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে চালু হওয়া নতুন ই-পাসপোর্টে আন্তর্জাতিক মানের নকশা আনার যুক্তি দেখানো হয়েছিল তখন।
কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অবস্থান ও জনমতের কথা উল্লেখ করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ বাক্যটি পুনর্বহালের দাবি উঠছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পাঠানো ওই চিঠিতে আগের নিয়ম পুনর্বহালের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। তবে সেটি মূলত কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল এবং সাধারণ পাসপোর্টে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। সূত্রগুলো জানায়, গত এপ্রিল ও চলতি মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও নীতিগত সম্মতি মিলেছে। এখন সব ধরনের পাসপোর্টেই ধাপে ধাপে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
পুরোনো পাসপোর্টধারীদের কী হবে
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাদের হাতে বর্তমানে পুরোনো ই-পাসপোর্ট রয়েছে, তাদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়নের সময় নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট দেওয়া হবে।
জলছাপে বড় পরিবর্তন
শুধু শব্দবন্ধ নয়, ই-পাসপোর্টের ভেতরের জলছাপেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে পাসপোর্টের বিভিন্ন পাতায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, অবকাঠামো ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের ছবি ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যক্তি বা ব্যক্তিনির্ভর নামের অনেক স্থাপনার ছবি বাদ দেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সংস্করণ থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, যমুনা সেতু, মডেল মসজিদ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে নৌকার প্রতীক, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির এবং মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের ছবি বাদ যাচ্ছে।
নতুন যেসব প্রতীক যুক্ত হচ্ছে
নতুন ই-পাসপোর্টে দেশের ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নতুন ই-পাসপোর্টের জলছাপে দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে যুক্ত করা হচ্ছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতীক। এর মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক বঙ্গভবন, জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত জামদানি শাড়ি, জাতীয় ফল কাঁঠাল ও জাতীয় মাছ ইলিশ।
পাশাপাশি স্থান পাচ্ছে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল, কুমিল্লার শালবন বিহার, বান্দরবানের নীলগিরি, রাজশাহীর আমবাগান, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক পানাম নগর।
এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি আলোচিত ছবিও নতুন জলছাপে যুক্ত করা হচ্ছে।
যেসব প্রতীক অপরিবর্তিত থাকছে
সরকার পুরো নকশা বদলে ফেলছে না। জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে বেশ কিছু পরিচিত প্রতীক আগের মতোই থাকছে।
ই-পাসপোর্টের নতুন সংস্করণেও অপরিবর্তিত থাকছে দেশের পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী বেশ কিছু প্রতীক ও স্থাপনার জলছাপ। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ফুল শাপলা, বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় পাখি দোয়েল, শহীদ মিনার, সুপ্রিম কোর্ট, শিখা অনির্বাণ, লালবাগ কেল্লা, হাতিরঝিল, বায়তুল মোকাররম, কার্জন হল, ষাট গম্বুজ মসজিদ, সুন্দরবন, চা–বাগান, সোনালি আঁশ পাট এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত ‘সংগ্রাম’ চিত্রকর্ম।
স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, পাসপোর্টের ভেতরের কিছু জলছাপ বাদ ও নতুন কিছু প্রতীক যুক্ত করার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারপ্রধানের অনুমোদন পেলেই তা বাস্তবায়ন শুরু হবে।