শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৯:২৪ অপরাহ্ন

ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলন : কার জয়, কার পরাজয় নাকি ড্র?

আরব-বাংলা রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬ ৮:৪৮ pm

ঝংনানহাইয়ের সেই প্রাচীন রাজকীয় উদ্যানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এমন কিছু গাছ দেখিয়ে মুগ্ধ করার চেষ্টা করলেন, যেগুলো খোদ আমেরিকার ইতিহাসের চেয়েও বয়সে অনেক পুরোনো।

কমিউনিস্ট পার্টির সদরদপ্তর হিসেবে পরিচিত ওই সংরক্ষিত এলাকায় শুক্রবার কেবল নিজেদের দোভাষীদের নিয়ে পায়চারি করার সময় একটি গাছের দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্পকে শি জিনপিং বলেন, ‘‘ওই পাশের মোটা গাছটির বয়স ৪০০ বছর।’’

দুই হাত নেড়ে বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে শি বলেন, ‘‘দেখুন, এর মধ্যে কী অদম্য প্রাণশক্তি আর ইতিহাস জড়িয়ে আছে!’’

এই কথোপকথন মূলত বিশেষ একটি বার্তারই বহিঃপ্রকাশ ছিল; যা ট্রাম্পের পুরো সফরজুড়ে তাকে দিতে চেয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। সেই বার্তাটি হলো, উভয় নেতা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন এবং দুই দেশকে সংঘাতের পথ থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব তাদেরই।

এর আগের দিন ‘টেম্পল অব হেভেনে’ আশা প্রকাশ করে শি জিনপিং বলেছিলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যেন ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ (উদীয়মান শক্তির সঙ্গে বিদ্যমান শক্তির সংঘাত অনিবার্য) এড়াতে পারে।

ঝংনানহাইয়ের সেই উদ্যানের বৃক্ষছায়ায় শি জিনপিংয়ের এই কথায় বেশ মজা পান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘‘বাহ, এগুলো এত বছর বেঁচে থাকতে পারে!’’ এরপর তিনি জানতে চাইলেন শি আর কতজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে এই উদ্যানে নিয়ে এসেছেন। এই প্রশ্নের মাধ্যমে বোঝাই যাচ্ছিল ট্রাম্প যাচাই করতে চাইছিলেন, তিনি কতটা বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছেন।

চীনা নেতা উত্তর দেন, ‘‘খুব কম।’’

শি হয়তো জানতেন না যে ট্রাম্প গাছপালার ব্যাপারে খুব একটা আবেগপ্রবণ নন। গত বছরই হোয়াইট হাউসের মাঠে তার পরিকল্পিত বিশাল বলরুম তৈরির জায়গা করতে সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন হার্ডিং এবং ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের স্মৃতিবিজড়িত কয়েক দশকের পুরোনো ম্যাগনোলিয়া গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছিল।

এই ঘটনাটি দুই নেতার মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বেরই প্রতিফলন। শি যখন ইতিহাস এবং পরাশক্তির দায়বদ্ধতার কথা ভাবছিলেন, ট্রাম্প তখন সেই মুহূর্ত থেকে নিজের জন্য তাৎক্ষণিক কী অর্জন করা যায় তা দিয়েই সবকিছু পরিমাপ করছিলেন।

• জয়ের পরিমাপ
তাহলে বিশ্বের দুই ক্ষমতাধর ব্যক্তির এই কূটনৈতিক দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত জিতল কে?

কিছু বিচারে দু’জনই জয়ী হয়েছেন।

শি দাবি করতে পারেন, তিনি ট্রাম্পকে চীন-মার্কিন সম্পর্কের এমন এক নতুন কাঠামোতে রাজি করাতে পেরেছেন; যার লক্ষ্য হলো গঠনমূলক এবং কৌশলগতভাবে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা।

নানজিং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ঝু ফেং দ্য স্ট্রেইট টাইমসকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের একটি ধারণা। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরকে পারমাণবিক ধ্বংসের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখত।

সেই তুলনায় শির প্রস্তাবিত স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী এই সংস্করণটি নেতিবাচক নয়, বরং গঠনমূলক। এটি সহযোগিতাকে মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা এবং প্রতিযোগিতাকে একটি সীমার মধ্যে রাখার আহ্বান জানায়।

আর এটি বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে দেওয়া একটি সংকেতও—তারা যেন চীনকে কনিষ্ঠ অংশীদার নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সমান স্তরের এক প্রতিদ্বন্দ্বী বা ‘বন্ধুপ্রতিম শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করে।

অন্যদিকে ট্রাম্পও দাবি করতে পারেন, তিনিও কিছু জিতেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান সংকট মোকাবিলায় বেইজিং সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও চীন ঠিক কী করতে প্রস্তুত তা এখনও স্পষ্ট নয়।

তবে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, প্রকৃতপক্ষে কেউই খুব বড় কিছু জিতেননি। তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের গভীর উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের অবস্থানে দৃশ্যমান কোনও পরিবর্তন আসেনি।

আবার ট্রাম্পও তার প্রত্যাশিত বড় কোনও বাণিজ্য চুক্তি পকেটে পুরতে পারেননি।

চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই সংখ্যা ছিল প্রত্যাশার চেয়ে কম। কৃষি বা জ্বালানি কেনাকাটার নির্দিষ্ট কোনও হিসাবও এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।

• বিশ্ব শান্তি
এই জয়-পরাজয়ের চশমা দিয়ে প্রায় এক দশক পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফরের অর্জন পরিমাপ করাটা হয়তো কিছুটা সংকীর্ণ হয়ে যাবে। সম্পর্কে স্থিতিশীলতা বজায় থাকাটাই এখানে বড় সাফল্য। শিকাগো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়াং দালি দ্য স্ট্রেইট টাইমসকে বলেছেন, এতে বিশ্বই জয়ী হয়েছে। কারণ ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্কের পারদ কিছুটা নামলে বিশ্বের বাকি দেশগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায়।

এছাড়া এটি ছিল ২০২৬ সালে শি-ট্রাম্পের সম্ভাব্য একাধিক সাক্ষাতের প্রথম রাউন্ড মাত্র। খেলা যখন এখনও চলছে, তখন এখনই জয়ী ঘোষণা করার তাড়া কেন?

যদি সেপ্টেম্বর মাসে ট্রাম্পের আমন্ত্রণে শি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন, নভেম্বর মাসে ট্রাম্প অ্যাপেক সম্মেলনে যোগ দিতে আবার চীনে আসেন এবং ডিসেম্বরে শি ফ্লোরিডায় জি-২০ সম্মেলনে যোগ দেন, তাহলে এ বছরই তাদের চারবার দেখা হতে পারে।

হয়তো এই কারণেই এবারের সম্মেলনে খুব বেশি সুনির্দিষ্ট বড় কোনও ঘোষণা আসেনি। দুই পক্ষই সম্ভবত তাদের কূটনৈতিক ‘উপহারগুলো’ এখনই খরচ করতে চাচ্ছে না, যাতে বড়দিন পর্যন্ত কিছু বাকি থাকে।

তড়িঘড়ি করা সফর দিয়ে প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার মতো কাঠামোগত দীর্ঘদিনের বৈরিতা মিটে যাবে—এমন আশা করাটা সবসময়ই অবাস্তব। তার চেয়ে বড় বিষয়, বিশ্বকে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া যে, তারা মিলেমিশে কাজ করতে পারে এবং দুই নেতাই যেন নিজ দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার মতো কিছু ব্যক্তিগত অর্জন নিয়ে ফিরতে পারেন।

• বিশেষ মর্যাদা
সবকিছুর ঊর্ধ্বে, দুই পক্ষ থেকেই ছিল তোষামোদের ছড়াছড়ি। ট্রাম্প শিকে একজন মহান নেতা হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং তার সঙ্গে ইলন মাস্ক ও জেনসেন হুয়াংয়ের মতো শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে এসেছেন; যা বেইজিংয়ের কাঙ্ক্ষিত বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার এক বড় প্রদর্শনী।

অন্যদিকে শি জিনপিংও আয়োজনে কোনও কমতি রাখেননি। জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা এবং সামরিক কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পকে আপ্যায়ন করা হয়েছে; যা তিনি পছন্দ করেন বলে সবাই অবগত।

তবে কিছু ব্যক্তিগত ছোঁয়াও ছিল। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের দ্বিতীয় ছেলে এরিক ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ করমর্দন করেন শি জিনপিং। বেইজিং জানে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তোষামোদ তখনই সবচেয়ে ভালো কাজ করে, যখন এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং তার পরিবারের সদস্যদের গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এমনকি রাষ্ট্রীয় ভোজসভার শেষে শেষ গান হিসেবে বাজানো হয়েছিল ‘ওয়াইএমসিএ’; যা ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তার প্রচারণার অলিখিত ‘সাউন্ডট্র্যাক’ হিসেবে পরিচিত।

ঝংনানহাইয়ের সেই প্রাচীন উদ্যানে ট্রাম্প যখন শুনলেন, খুব কম বিদেশি নেতাকেই মাও সে তুংয়ের স্মৃতিবিজড়িত ওই সংরক্ষিত এলাকায় আসার সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তিনি বেশ সন্তুষ্টই হয়েছিলেন।

তবে তিনি হয়তো যা জানেন না তা হলো, ২০২৪ সালের মে মাসে শি এই একই স্থানে ভ্লাদিমির পুতিনকেও চা-চক্রের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই সফরের শেষে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গিয়েছিল রুশ নেতাকে দুই হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরছেন শি জিনিপিং; যেটিকে ট্রাম্প তার সফরের আগে ‘বড় ও উষ্ণ আলিঙ্গন’ হিসেবে প্রত্যাশা করেছিলেন; কিন্তু এবার তা পাননি।

ট্রাম্পের চীন ত্যাগের কয়েক দিনের মধ্যেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিং পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই কূটনীতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বেইজিং ওয়াশিংটনকে কাছে টানতে চায় ঠিকই, কিন্তু মস্কোর হাত ছাড়তে রাজি নয়। তারা নিজেকে এমন এক অপরিহার্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়; যারা সবার সঙ্গে নিজ শর্তে কথা বলতে সক্ষম।

পরাশক্তিদের কূটনীতিতে প্রত্যেকেই বিশ্বাস করতে চায় যে, সে অন্য সবার চেয়ে আলাদা বা বিশেষ। কিন্তু ঝংনানহাইয়ের সেই প্রাচীন গাছগুলো হয়তো ইতিহাসের আরও অনেক রদবদল দেখেছে; যা এই ধারণার চেয়ে ভিন্ন।

সূত্র: দ্য স্ট্রেইট টাইমস।

শেয়ার করুন

  • Facebook
  • Twitter
  • Digg
  • Linkedin
  • Reddit
  • Google Plus
  • Pinterest
  • Print
আরো
© All rights reserved © arabbanglatv

Developer Design Host BD