শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪১ অপরাহ্ন

মুরাদনগরে নৃশংসতার: জনমনে আতঙ্ক, বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা

আরব-বাংলা রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ৫ জুলাই, ২০২৫ ২:০৮ am
মুরাদনগরে নৃশংসতার: জনমনে আতঙ্ক, বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা

কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা বর্তমানে চরম নৈরাজ্য ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সম্প্রতি চারটি চাঞ্চল্যকর খুন, একটি ভয়াবহ ধর্ষণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নির্মম নির্যাতনের ভিডিও দেশব্যাপী ক্ষোভ ও আলোচনার ঝড় তুলেছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অপরাধপ্রবণতার লাগামছাড়া এই উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন এলাকার সচেতন মহল।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, গত আগস্টের পর থেকে মুরাদনগরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র এলাকায় সন্ত্রাস, ধর্ষণ, হত্যা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গত ২৮ জুন। ওইদিন উপজেলার বাহেরচর গ্রামে এক সংখ্যালঘু নারীকে গণধর্ষণের পর বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় সারা দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।

তবে এখানেই শেষ নয়। ধর্ষণের রেশ কাটতে না কাটতেই গত বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার কড়ইবাড়ী গ্রামে গণপিটুনির নামে একই পরিবারের তিনজনকে হত্যা করা হয়। নিহতরা সবাই কৃষক পরিবারের সদস্য। স্থানীয়রা জানান, মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাদের হত্যা করে।

এরপর বিকেলে ইউসুফনগর গ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয় নির্মাণ শ্রমিক মনির হোসেনের লাশ। পারিবারিক কলহ এবং ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক দেখে ফেলায় মনিরকে হত্যা করে ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখে ঘাতকরা। এ ঘটনাটিও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

এইসব ভয়াবহ ঘটনার ফলে সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, কৃষক, এমনকি প্রশাসনের ছোট কর্মকর্তারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কোম্পানীগঞ্জ বাজার বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি চন্দন বণিক বলেন, “রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে মুরাদনগর অচিরেই বিপজ্জনক এলাকায় পরিণত হবে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু বলেন, “প্রতিটি অপরাধে এখন রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হচ্ছে। অপরাধীদের বিচার না হয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা আড়াল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ জনগণের বিচার পাওয়ার আশা একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যাবে।”

মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুর রহমান বলেন, “বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে স্থানীয়ভাবে যে দ্বন্দ্ব চলছে, তার প্রভাব আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পড়ছে। অনেক সময় আমরা নিরপেক্ষভাবে পদক্ষেপ নিতে পারি না। অপরাধীরা রাজনৈতিক মদদে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।”

এদিকে কুমিল্লার পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান জানিয়েছেন, “আমরা প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করছি। ধর্ষণকাণ্ড প্রায় ডিটেক্ট হয়ে গেছে এবং চারটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি ঘটনার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা দ্রুত অগ্রগতি আশা করছি। তবে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা কঠিন।”

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, “রাজনৈতিক বিভাজন থাকলে চরমপন্থার উত্থান ঘটে। বর্তমানে মুরাদনগরে সেই অবস্থাই তৈরি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামাল দিতে গিয়ে মূল দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হচ্ছে।”

স্থানীয়রা মনে করছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজন সবার আগে রাজনৈতিক ঐক্য। সমাজের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যদি নিজেদের স্বার্থের চেয়ে জনগণের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন, তবে এই অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব। এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বাড়িয়ে অপরাধীচক্রকে চিহ্নিত ও দমন করার দাবি জানিয়েছেন সকলে।

মুরাদনগরের সাম্প্রতিক চিত্র দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়—এটি সরাসরি জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। এখনই যদি রাজনৈতিক ঐক্য এবং প্রশাসনিক আন্তরিকতা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে মুরাদনগর হতে পারে আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের নাম।

শেয়ার করুন

আরো
© All rights reserved © arabbanglatv

Developer Design Host BD