ধনী-গরিব, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত। তরুণ-তরুণী, পৌঢ় বা বৃদ্ধ–সব বয়সে, সব শ্রেণিতে তালাকের হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকায় প্রতি ঘণ্টায় একটিরও বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক হচ্ছে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি থেকে মে ২০২৬) মোট চার হাজার ৯৮৯টি তালাক কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দুই হাজার ২৯৭টি এবং উত্তর সিটিতে দুই হাজার ৬৯২টি তালাক কার্যকর হয়েছে। তালাকের আবেদনে এগিয়ে আছেন নারীরা, যা গড়ে প্রায় ৭১ শতাংশ।
‘কবুল’ শব্দে দুটি মানুষের জীবনে যে আনন্দ বয়ে আনে, ‘তালাক’ শব্দে তা বিষাদে রূপ নিচ্ছে। একটি স্বাক্ষর, একটি নোটিশ কিংবা কিছু আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ হয়ে যাচ্ছে দাম্পত্য জীবন। ভেঙে যাচ্ছে দুটি পরিবারের স্বপ্ন, অসংখ্য প্রতিশ্রুতি আর সারাজীবন একসঙ্গে পথ চলার অঙ্গীকার। নিমেষেই অতীত হয়ে যাচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর অনেক পরিকল্পনা, অনেক সুখস্মৃতি।
বিবাহ বিচ্ছেদে বেশিরভাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে মনের অমিল, ভরণপোষণ না দেওয়া, স্বামী বা স্ত্রীর মাদকাসক্তি, পরকীয়া, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, পারস্পরিক অসম্মান এবং সহনশীলতার অভাব।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২, ৪ ও ১০-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী এনটিভি অনলাইনকে বলেন, বর্তমানে নারীদের শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। এ কারণে অন্যায়ভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হলে এখন তারা সহজে মেনে নেয় না। অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, পুরুষের ওপর নির্ভরশীল নন। এসব কারণ তালাকের হারে প্রভাব ফেলতে পারে। দেখা গেছে তালাকের পর অনেক নারী সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্বও নিজেই গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, পুরুষের ক্ষেত্রে বেটার অপশনের খোঁজ, পারিবারিক নানা জটিলতাও তালাকের অন্যতম কারণ হিসেবে আমাদের সামনে আসে।
উত্তরে সংসার ভাঙছে বেশি
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটির তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে উত্তর সিটি করপোরেশনে। এর মধ্যে কারওয়ান বাজার, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, আদাবর, সেখেরটেক, চন্দ্রিমা মডেল টাউন, বছিলা ও রায়েরবাজার নিয়ে গঠিত উত্তরের অঞ্চল-৫ এ সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৬৬৬টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৫৭২টি আবেদনই করেছেন নারী। অর্থাৎ এখানে ৮৫ শতাংশ বিচ্ছেদ চেয়েছেন নারীরা, যা দুই সিটির করপোরেশনের ২০টি অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ।
দক্ষিণের পুরান ঢাকা ও আশপাশে তালাক বেশি
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ধানমণ্ডি, হাজারীবাগ ও রায়েরবাজার নিয়ে গঠিত অঞ্চল-৩ তালাকপ্রবণ এলাকা। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এখানে মোট তালাক হয়েছে এক হাজার ৭৩০টি। এর মধ্যে স্ত্রীর আবেদন ছিল এক হাজার ৩২৭টি এবং স্বামীর ৪০৩টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত এ অঞ্চলে মোট তালাক হয়েছে ৬৭৫টি, যার মধ্যে নারীরা দিয়েছে ৬০৭টি এবং পুরুষ ৬৮টি।
নারীরাই বেশি বিচ্ছেদের আবেদন করছেন
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন নারীই। গত পাঁচ মাসে কার্যকর হওয়া চার হাজার ৯৮৯টি তালাকের মধ্যে স্ত্রীর আবেদন ছিল তিন হাজার ৫৮৩, অর্থাৎ ৭১.৯ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারজানা আহমেদ এনটিভি অনলাইনকে বলেন, সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা, বৈষম্যমূলক আচরণ ও মানসিকতা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেক সময় নির্যাতন ও অসম্মান মুখ বুজে সহ্য না করে অনেক নারী ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অনেক নারী আগের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় তারা সহজেই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সবচেয়ে কম তালাকের আবেদন যেখানে
তালাকের জন্য সবচেয়ে কম অর্থাৎ ৪৪টি বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ১০-এ। এই অঞ্চলের মধ্যে আছে মধ্য বাড্ডা, উত্তর বাড্ডা, হয়দাওকান্দি, সোনা কাটরা, সেকান্দারবাগ, মোল্লাপাড়া, ময়নারটেক, বাওয়ালীপাড়া, মিছরী টোলা, তালতলা, বড় বেরাইদ পূর্বপাড়া, বড় বেরাইদ ভুঁইয়াপাড়া, বড় বেরাইদ ঋষিপাড়া, বড় বেরাইদ আরাদ্দাপাড়া, বেরাইদ আশকারটেক, হারারদিয়া, নিগুর অ্যাপ্লাইদ (ফকিরখালী)।
‘মনের অমিলে’র আড়ালে অসংখ্য গল্প
অনুসন্ধানে দেখা যায়, তালাকের আবেদনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মনের অমিল’। কিন্তু এই দুটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকে না বলা অসংখ্য গল্প। কোথাও বছরের পর বছর চলা শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, কোথাও মাদকাসক্তি, কোথাও ভরণপোষণ না পাওয়া, আবার কোথাও পরকীয়ার কারণে ভেঙে যাচ্ছে সংসার। ছোট ছোট ভুল, পারিবারিক অহংবোধ, যোগাযোগের অভাব ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছে যে সেখান থেকে তা গড়িয়েছে বিচ্ছেদে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তালাক ও সালিশি পরিচালনের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তারা বলেন, এখন অনেক দম্পতি সমস্যার শুরুতেই আলোচনার পরিবর্তে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে অনঢ় থাকেন। পরকীয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি, নগরজীবনের ব্যস্ততা, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং সহনশীলতার অভাব সংসার ভাঙনের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।
স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই কৌশলের আশ্রয়
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তালাকের নোটিশেও নানা কৌশল এবং প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়। কাজী অফিস থেকে সিটি করপোরেশন হয়ে যে নোটিশ পৌঁছে স্বামী বা স্ত্রীর কাছে, সেগুলোতে দেখা যায়, সেখানে ঠিকানা লিখতে গিয়ে কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। প্রতিপক্ষের পূর্ণ ঠিকানা জানা থাকা সত্ত্বেও অনেকে হোল্ডিং নম্বর (বাড়ি বা রোড) উল্লেখ না করে শুধু এলাকার নাম লিখেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘একজন ঠিকানার ঘরে লিখেছেন ধানমণ্ডি। এখন ধানমণ্ডিতে তো অনেক রোড, অনেক বাসা। তখন ডাকপিয়ন সঠিক ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে চিঠি ফেরত নিয়ে যান। এটাকে তিনি ইচ্ছাকৃত প্রতারণা বলে উল্লেখ করেন।
সিটি করপেরশনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের হাতে আসা নোটিশগুলো ঠিকানা মতো পাঠালেও তা ফিরে আসে। অনেকে আবার তা গ্রহণই করে না।
পূর্ণ ঠিকানাহীন তালাকের নোটিশ, ভুক্তভোগী অনেকে!
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কাজী অফিস থেকে পাঠানো বেশিরভাগ তালাকের নোটিশে পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা বা যোগাযোগের তথ্য থাকে না। ডাকযোগে পাঠানো নোটিশ ফেরত আসে। অনেক সময় ভুক্তভোগী নোটিশের সন্ধানই পায় না। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া তো থেমে থাকে না। নির্ধারিত ৯০ দিন শেষে তালাক কার্যকর হয়ে যায়। ভুক্তভোগী অনেকে পরে সিটি করপোরেশনে এসে জানতে পারে, তাদের সংসার আইনি প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে। এ কারণে পুনর্মিলনের সুযোগও আর থাকে না।
তালাকের নোটিশে পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না থাকা প্রসঙ্গে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী বলেন, বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। আমাদের কাছে যে নোটিশগুলো আসে, সেগুলোতে দেখা যায়, অনেক সময় আবেদনকারী সঠিক ঠিকানা দেন না। ফলে আমরা চিঠি পাঠালেও তা ফেরত আসে। অনেকে আবার ইচ্ছাকৃতভাবে চিঠি গ্রহণ করেন না। তাই ঠিকানার সঙ্গে মোবাইল নম্বর সংযুক্ত করা এখন খুবই জরুরি।
ভূতুড়ে দেনমোহরও দ্রুত বিচ্ছেদের কারণ
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিয়ের মাত্র এক থেকে তিন মাসের মধ্যেও অনেক বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন তারা পেয়েছেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে সংসার ভাঙা এসব বিয়ের কাবিননামায় দেনমোহর থাকে আকাশচুম্বি, ১০ লাখ টাকা থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এসব ক্ষেত্রে নারীরা বেশি বিচ্ছেদের আবেদন করছেন বলেও জানান তারা।
এ প্রসঙ্গে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী বলেন, কিছু নারীর ক্ষেত্রে প্রতারণায় জড়িত থাকার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। তারা বেশি অঙ্কের দেনমোহর নির্ধারণ করে বিয়ে করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই দেনমোহরের অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে তালাক দেন। শুধু তাই নয়, অনেকেই আবার তার পূর্বের বিয়ের কথা গোপন করেন। তাই বিয়ে, কাবিন, তালাকসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে অনলাইনভিত্তিক করার ওপর জোর দেন তিনি।
তালাকের ভুক্তভোগী শিশুরা
বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় তাদের সন্তানরা। তারা মানসিক, আর্থিক, সামাজিক নানা চাপের মধ্যে বড় হয়। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম খান বলেন, ‘কেউ আসলে সুখে থাকলে তালাকের সিদ্ধান্ত নেয় না। সম্পর্কের মধ্যে গুরুতর সমস্যা তৈরি হয় বলেই মানুষ এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। তবে ভাঙা পরিবারের শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিবারে অশান্তি পরবর্তী সময়ে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে তাদের পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক, স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাও বাধাগ্রস্ত হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারজানা আহমেদও এ প্রসঙ্গে বলেন, তালাকের পর অনেক শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, একাকিত্ব, পড়াশোনায় অমনোযোগ এবং আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয়। তালাক অনিবার্য হলে শিশুদের সামনে পারস্পরিক দোষারোপ এড়িয়ে চলা, উভয় অভিভাবকের সঙ্গে শিশুর নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।