শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন

গুদাম থেকে চাল লোপাট সরকারি কর্মকর্তার, প্রতিবেদনে নেই তথ্য

আরব-বাংলা রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৩ ৭:৩০ am

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (বর্তমানে রাজবাড়ীর পাংশায় বদলি) ইকবাল মাহমুদের বাসভবন থেকে সম্প্রতি ১৩ বস্তা চাল ও ১১০০ খালি বস্তা জব্দ করা হয়। এর পর সেগুলো সিলগালা করে উপজেলা প্রশাসন। এ ছাড়া খাদ্যগুদামে ১৮ টন চালেরও ঘাটতি ছিল। কিন্তু এ নিয়ে করা তদন্ত প্রতিবেদনে এই ঘাটতির তথ্য নেই। এতে হতাশ হয়েছেন উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়রা।

ইকবাল মাহমুদের বাসভবনের সেই ঘর সিলগালা করার পরদিনই ঘরে থাকা আলামত নষ্ট করার জন্য গ্রিল কেটে জব্দকৃত চাল-বস্তা সরাতে চেষ্টার অভিযোগ উঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ১৮ টন চালের ঘাটতি মেটাতে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার যোগসাজশে বাইরে থেকে চাল কিনে গুদামের ভেতর ঢুকিয়ে চালের ঘাটতি পূরণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র ও সরেজমিনে জানা যায়, গত ১১ নভেম্বর ১৩ বস্তা সরকারি চাল ও এক হাজার ১০০টি খালি বস্তা অবৈধভাবে মজুত রাখার দায়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল মাহমুদের বাসভবনটি সিলগালা করে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল মামুন।

এই ঘটনার পরদিন ১২ নভেম্বর সন্ধ্যায় সেই সিলগালা বাসভবনের জানালার গ্রিল কেটে মালামাল সরানোর সময় ইউএনওর হাতে ধরা পড়েন ইকবাল মাহমুদ। তবে এ সময় একটি সাদা ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যান ইকবাল মাহমুদের সহযোগী নিরাপত্তাপ্রহরী আবু হানিফ খান (রুবেল)। মোবাইল ফোন ও প্রয়োজনীয় জামাকাপড় বের করার জন্য গ্রিলটি কেটেছেন বলে জানান ইকবাল ও আবু হানিফ। তবে একটি সূত্র বলছে, সিলগালা বাসার ভেতরে থাকা মোটা অংকের টাকা সরাতেই এমন কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন ইকবাল।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্যগুদামে ১৮ টন চালের ঘাটতি পূরণে বাইরে থেকে বস্তায় চাল এনে ঘাটতি পূরণ করা হয়
ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্যগুদামে ১৮ টন চালের ঘাটতি পূরণে বাইরে থেকে বস্তায় চাল এনে ঘাটতি পূরণ করা হয়। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট
ঘটনার বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করতে ১৩ নভেম্বর ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। এতে সদস্য করা হয় ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. নুরুল হক, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কারিগরি খাদ্য পরিদর্শক মো. মিজানুর রহমান ও জাজিরা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সেলিম আহমদকে।

তদন্তকালে খাদ্যগুদামে ১৮ টন চালের ঘাটতি ছিল। তিন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিলে গত ১৪ নভেম্বর ১০ টন ও ১৫ নভেম্বর ৮ টন চাল ট্রাকে করে বাইরে থেকে এনে খাদ্যগুদামে রেখে ঘাটতি পূরণ করেন। বিষয়টি ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানতে পেরে ওই তদন্তকারী তিন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করলে বাইরে থেকে খাদ্যগুদামে ১০ টন চাল ঢোকানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে ১৬ নভেম্বর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে খাদ্যগুদামে চালের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে বিষয়টি দুদককে অবহিত করা হলে সোমবার ওই খাদ্যগুদামে এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করেন মাদারীপুর জেলা কার্যালয়ের দুদকের একটি দল।

স্থানীয় বাসিন্দা মনোয়ার সরদার, ইমন বেপারীসহ কয়েকজন বলেন, ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্যগুদাম তৈরি হওয়ার পর চাল ও বস্তা চুরির ঘটনা এই প্রথম। ইকবাল মাহমুদ আসার পর এমন চুরির ঘটনা ঘটল, যা দুদক পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাঁরা এমন কর্মকর্তার বিচার দাবি করেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী উপজেলা খাদ্যগুদামের নিরাপত্তাপ্রহরী মোক্তার হোসেন বলেন, ‘ইকবাল মাহমুদ স্যার আসার পর থেকে যখন গোডাউন থেকে চাল সরিয়ে তার বাসায় রেখেছিল, আমি তখন বলেছিলাম এটি অন্যায়। পরে আমি বিষয়টি ডিসি ফুড স্যারকে জানালে তিনি উল্টো আমাকে চুপ থাকতে বলেন। এই ঘটনার কিছুদিন পরই ইউএনও স্যার ইকবাল মাহমুদ স্যারের বাসা থেকে চাল জব্দ করে বাসা সিলগালা করে দেয়। তার পরের দিন ইকবাল মাহমুদ স্যার সন্ধ্যায় মিস্ত্রি এনে বাসার গ্রিল কেটে আরেক নিরাপত্তাপ্রহরী আবু হানিফকে নিয়ে বস্তা বের করছিলেন। তখন ইউএনও স্যার চলে এলে আবু হানিফ কিছু বস্তা আর বাজারের একটি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। ওই ব্যাগ ভর্তি টাকা ছিল, যেটা গ্রিল মিস্ত্রি দেখেছে বলে আমাকে জানায়।’

গোডাউনে চাল ঢোকার বিষয়ে মোক্তার বলেন, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই গোডাউনে ট্রাকে করে চাল ঢুকেছে আমি সেটা দেখেছি। ট্রাকের কিছু চাল গোডাউনে ঢুকিয়েছে। এ ছাড়া স্যার গোডাউন থেকে মাঝে মাঝে চাল বিক্রি করতেন। চাল কম পাওয়ায় চেয়ারম্যান ও ঠিকাদারদের সঙ্গে ইকবাল মাহমুদ স্যারের মাঝেমধ্যে তর্ক হতো।’

খাদ্যগুদামের নিরাপত্তা প্রহরী আবু হানিফ খান (রুবেল) টাকার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তিনি খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাসার গ্রিল কাটার পর জামাকাপড়ের ব্যাগ ও মোবাইল বের করে ভয়ে পালিয়েছিলেন। কোনো টাকার ব্যাগ বের করেননি বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘মোবাইল বের করার জন্য গ্রিল কেটেছিলাম। কিন্তু বস্তা বের করার জন্য কাটিনি। খাদ্যগুদামের মালামাল পরিপূর্ণ রয়েছে, কোনো ঘাটতি নেই।’

ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পর্যাপ্ত তথ্য আমার হাতে থাকার কারণে তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা ও খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদকে আমি চিঠি দিয়েছি। এ ছাড়া জেলা প্রশাসক মহোদয় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যসচিব বরাবর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি লিখেছেন।’

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ইকবাল মাহমুদের বাজে কাজের জন্য বা শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখেছি। অচিরেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাকে রাজবাড়ী পাংশায় বদলি করা হয়েছে। আমরা যে তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি, তাতে লেখা হয়েছে ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্যগুদামের চতুর্থ শ্রেণির দুই কর্মচারীদের অন্যত্র বদলি করা হোক। খাদ্যগুদাম ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রুমে যে ১৩ বস্তা চাল পাওয়া গেছে, তা অবৈধ মজুদ। এ ছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে খাদ্যগুদামের মালামাল পরিপূর্ণ রয়েছে, কোনো ঘাটতি নেই। নতুন যে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসেছেন, তিনি সব সঠিক পেয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন।

শেয়ার করুন

আরো
© All rights reserved © arabbanglatv

Developer Design Host BD