সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ০৬:০৯ অপরাহ্ন

সাফারি পার্কে ১০ বছর প্রাণী আমদানি নেই, হারাচ্ছে আকর্ষণ

আরব-বাংলা রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৩ ৬:৫৮ am

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। শুরুতে শত শত দর্শানার্থীদের ভিড় থাকলেও দিন দিন এখানে ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা কমছে। বিশেষ করে গত ১০ বছর ধরে নতুন কোনো বন্যপ্রাণীর আমদানি না থাকায় আকর্ষণ হারাতে বসেছে পার্কটি। এছাড়া এই পার্কের নানা অব্যবস্থাপনার ছাপও ফুটে উঠেছে। গত দুই বছরে মারা গেছে অনেক মূল্যবান প্রাণী।

২০১৩ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক উদ্বোধন করা হয়। মোট ৩৮১ একর জায়গা জুড়ে পার্কটি গড়ে তোলা হয়। প্রতিষ্ঠার সময় কয়েক ধাপে দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাণী আমদানি হয় এই পার্কটিতে। আমদানি করা প্রাণীর মধ্যে ছিল- বাঘ, সিংহ, হরিণ, অরিক্স, ওয়াইল্ডবিস্ট, কমন ইলান্ড, জেব্রা, জিরাফ, ক্যাঙ্গারু, গয়াল, ভালুক ও কুমির। এছাড়াও আনা হয় ময়ূর, পেলিক্যান, ম্যাকাও, ধনেশ, মদনটাকসহ বিভিন্ন প্রজাতির কিছু পাখি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের অভ্যন্তরের উন্মুক্তস্থানে প্রাণী দেখার জন্য আটটি পর্যটক মিনি বাস থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে ছয়টি। আবার সচল বাসের সবগুলোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও নষ্ট। প্রাণী দেখার জন্য আফ্রিকান কোর সাফারির ভেতরে রাস্তা ভাঙ্গাচোরা। রাস্তাগুলোতে মিনিবাস চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। সাফারি পার্কে পর্যটকদের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও ৫ বছর ধরে নষ্ট। পার্কের বিশালাকার লেকে থাকা প্যাডেল বোটগুলো জরাজীর্ণ ও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বহুদিন ধরে।

পুরুষ শূন্য জিরাফের পাল: পার্ক প্রতিষ্ঠার সময় কয়েক ধাপে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে মোট ১০টি জিরাফ আনা হয়। পার্কে জিরাফ বাচ্চাও জন্ম দিয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময় কিছু জিরাফ মারা যায়। শেষ পর্যন্ত টিকে আছে তিনটি স্ত্রী জিরাফ। ফলে জিরাফের পালে নতুন করে বাচ্চা পাওয়ার সম্ভাবনা আর নেই। পুরুষশূন্য থাকলেও নতুন করে জিরাফ আমদানির কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে সর্বশেষ পুরুষ জিরাফটি মারা যায়।

ছয়টির মধ্যে চার সিংহ অসুস্থ: সাফারি পার্কে ছয় সদস্যের সিংহের পালের চারটিই অসুস্থ। এসব সিংহদের মধ্যে তিনটি স্ত্রী ও একটি পুরুষ। অসুস্থ সিংহ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ফলে সুস্থ দুটি সিংহ থাকলেও পর্যটকরা সেগুলোকে বেশিরভাগ সময়ই দেখতে পান না। সর্বশেষ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি সিংহ মারা যায়।

ছয় বছর একাকী পেলিকেন: ২০১৩ সালে একজোড়া পেলিক্যান আনা হয় পার্কে। ২০১৭ সালে একটি পেলিকেন অসুস্থ হয়ে মারা যায়। এরপর থেকেই অপর পেলিকেনটি একাকী দিন কাটাচ্ছে। নতুন করে আর কোনো পেলিকেন আনার উদ্যোগ দেয়নি পার্ক সংশ্লিষ্টরা।

৬ বছর খাঁচায় বন্দী লেপার্ড: নারায়ণগঞ্জ থেকে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার একজোড়া লেপার্ড ছয় বছর ধরে খাঁচায় বন্দী। পর্যটন সম্ভাবনা থাকলেও আকর্ষণীয় এই প্রাণীটিকে দর্শনার্থীদের সামনে প্রদর্শনের কোনো ব্যবস্থা করেনি কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক ছাড়া আর কোথাও এই প্রাণীটি নেই।

বিলীন আকর্ষণীয় প্রাণী ক্যাঙ্গারু: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে ছিল চারটি ক্যাঙ্গারু। ২০১৪ সালে তিনটি ক্যাঙ্গারু আমদানি করা হয়। এগুলোর মধ্যে একটি স্ত্রী বাচ্চা প্রসব করে। এতে ক্যাঙ্গারুর পাল হয় ৪ সদস্যের। কিন্তু ২০১৮ সাল পর্যন্ত কয়েক ধাপে রোগে ভুগে মারা যায় সবগুলো প্রাণী। এরপর সাফারি পার্কে আর আনা হয়নি আকর্ষণীয় এই প্রাণীটিকে।

শিশু পার্কের রাইড নষ্ট: সাফারি পার্কের উত্তর-পশ্চিম অংশের বিশাল এলাকা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত শিশু পার্কের অবস্থা জরাজীর্ণ। সেখানে ১৫টি রাইডের মধ্যে প্রায় সবগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পর্যটকরা ভেতরে প্রবেশ করলেও লক্করঝক্কর রাইডে শিশুদের উঠতে দেন না।

লোকবল সংকট: সাফারি পার্ক ব্যবস্থাপনায় লোকবল ঘাটতি শুরু থেকেই। এতগুলো বন্যপ্রাণীর চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন। পুরো পার্কের ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সপেক্টর একজন, আর ওয়াইল্ডলাইফ সুপারভাইজারও একজন। এছাড়া জুনিয়র ওয়াইল্ডলাইফ স্কাউট ও অন্যান্য পদে লোকবল অপ্রতুল। পুরো পার্ক চলছে মাত্র ৭২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে।

এছাড়াও সাফারি পার্কে বিশালাকার লেক ভর্তি ছিল বিচিত্র প্রজাতির হাঁস ও পাখি দিয়ে। লেকে প্যাডেল বোট ছিল, ছিল একটি দৃষ্টিনন্দন ভাসমান সেতু। এগুলো বর্তমানে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। দশ বছর ধরে বয়সজনিত কারণে ও রোগাক্রান্ত হয়ে প্রাণী মারা গেলেও পার্ক সংশ্লিষ্টরা নতুন করে আমদানির উদ্যোগ নেয়নি। এতে সাফারি পার্ক বিমুখ হয়ে পড়েছেন পর্যটকরা। তারা টাকা খরচ করে পার্কে প্রবেশের পর হতাশা নিয়ে ফিরে যান।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, জরুরি অবস্থায় সিংহ, জিরাফ ও অরিক্সসহ কিছু আকর্ষণীয় প্রাণী আনা দরকার। পর্যটকদের জন্য অন্তত ১২ থেকে ১৫ টি মিনিবাস দরকার। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

আরো
© All rights reserved © arabbanglatv

Developer Design Host BD