শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ০৭:২৬ পূর্বাহ্ন

কমতে শুরু করেছে আলুর দাম, বাজারে ফিরছে স্বস্তি

আরব-বাংলা রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ৭:২৬ am

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাড়াশি অভিযানের পর কমতে শুরু করেছে আলুর দাম। গত তিন-চার দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি আলুতে দাম কমেছে ৬-১০ টাকা। গত সপ্তাহেও রংপুর নগরীর কাঁচাবাজারগুলোতে যে আলু সর্বোচ্চ ৪৫-৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছিল, তা রোববার নেমেছে সর্বনিম্ন ৩৬-৪০ টাকায়।

বিক্রেতারা বলছেন, আলুর বাজার বড় বড় কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা নিয়ন্ত্রণ করে। এখন ভোক্তা অধিকারসহ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নামাতে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে, একারণে দামও কমতে শুরু করেছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরোনো আলুর মজুত আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে। একারণে পুরোনো আলুর সরবরাহ কমানোর চেষ্টা করেছিল একটি চক্র। তবে এখন সরকার নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি হচ্ছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের উৎপাদন, চাহিদা ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভা করেন। ওইদিন ডিম, আলু ও পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। প্রতি পিস ডিমের দাম ১২ টাকা, আলুর কেজি ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা এবং পেঁয়াজের দাম ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে নির্ধারণ করা হয়। সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ জেলা প্রশাসকদের বাজার মনিটরিং করতে নির্দেশ দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

রোববার সকালে নগরীর সিটি বাজার, শাপলা চত্বর খান বহুমূখী মার্কেট ও কামাল কাছনা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রকারভেদে আলুর দাম কেজিতে ৫-১০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। সিটি বাজারের পাইকারী বিক্রেতারা জানান, বর্তমানে সরকার নির্ধারিত মূল্যে তারা আলু বিক্রি করছেন। শনিবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে সিটি কাঁচা বাজারে ৩৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি শুরু হয়। এর আগে শহরের বিভিন্ন কোল্ড-স্টোরেজ থেকে আলু সরকারি মূল্যে সরবরাহ করা হয়।

সিটি বাজারে পাইকাররা কার্টিনাল আলু ৩৫-৩৬ টাকা কেজি, শিল আলু ৪৭-৪৮ টাকা, ঝাউ ৫৪-৫৫ কেজি বিক্রি করছেন। এছাড়া পেঁয়াজ (এলসি) ৩৬ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৬৫ টাকা, মরিচ ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। সেখানকার লাকী ভান্ডারের শুকুর আলী জানান, সরকার আলুর বাজারে লাগাম টেনে ধরায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে বড় বড় কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা এখনো তাদের জিম্মি করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে খুচরা বাজারে কার্ডিনাল আলুর ৩৮-৪০ টাকা, সাদা দেশি আলু ৫০-৫২ টাকা এবং ঝাউ ৫৫-৬০ টাকা, শিলআলু ৫০-৫৫ টাকা টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব আলুর আকার ও ধরণ ভেদে দাম উঠানামা করছে বলেও জানিয়েছে খুচরা ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ভোক্তা অধিকার, জেলা প্রশাসন, এনএসআই’সহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কঠোর মনিটরিং ও ব্যবসায়ীদের সহনশীল মনোভাবের কারণে রংপুরে আলুর বাজারে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইছে।

শাপলা চত্বর খান বহুমূখী মার্কেটের সবজি বিক্রেতা আনাম ইসলাম বলেন, এখন সরকার নজরদারি বাড়িয়েছে, এজন্য পাইকাররাও দাম কমিয়েছে। আমরা ৩৬ টাকা কেজিতে আলু কিনে সেটা ৩৮-৪০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। অন্যদিকে কামাল কাছনা বাজারের সবজি বিক্রেতা আনোয়ার বলেন, পাইকারি বাজারে ৩৫-৩৬ টাকা দরে আলু কিনে ৪০ টাকার বেশি বিক্রি না করলে খুচরা ব্যবসায়ীদের লোকসান হবে। এ কারণে আলু কেনা আপাতত বন্ধ করেছি। আগের কিছু আলু আছে সেগুলো সামান্য লাভে বিক্রি করছি।

নগরীর এরশাদ মোড় কাঁচাবাজারে আসা রাজু আহম্মেদ জানান, কার্ডিনাল আলুর দাম সামান্য কমেছে। কিন্তু অন্যান্য আলুর দাম তেমন কমেনি। বড় বড় ব্যবসায়ীদের শক্তভাবে ধরতে পারলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন জোরালো পদক্ষেপ না থাকায় ব্যবসায়ীরা এখনো সিন্ডিকেট করার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি ওই বাজার থেকে পাঁচ কেজি শিল আলু (বড় আকার) ২৮০ টাকায় কিনেছেন বলেও জানান।

রংপুর সিটি কাঁচাবাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবু বলেন, কিছুদিন আগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এসেছিলেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে আমাদের মিটিং হয়েছে। এরপর কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের মালিক এবং ব্যবসায়ী নেতা যারা রয়েছেন সবাই মিলে আমরা সরকারের বেধে দেওয়া দামে আলু বিক্রি শুরু করেছি। একজন ক্রেতাকে সর্বোচ্চ ৫ কেজির বেশি আলু দিচ্ছি না। সিটি কাঁচা বাজারে প্রতিদিন ২০০ থেকে আড়াইশ বস্তা আলুর প্রয়োজন হয়।

রংপুর জেলা প্রশাসন জানায়, রংপুর এর বিভিন্ন বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ৩০ টাকায় আলু সরবরাহ ও ক্রেতাদের কাছে ৩৬ টাকায় বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় কোল্ড স্টোরেজগুলো এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন কোল্ড-স্টোরেজ এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, প্রতি কেজি আলুতে উৎপাদন খরচ সাড়ে ৯ টাকা, হিমাগার ভাড়া ৬ টাকা, বস্তার মূল্য ১.৪০ টাকা, পরিবহন, লোডিং আনলোডিং এক টাকা এছাড়া ওজন,ব্যাংক ঋণের সুদ ও অন্যান্য ব্যয় ১.৬০ টাকা ধরে মোট খরচ ১৯.৫০ টাকা। অথচ মৌসুমের শেষে এসে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা ছাড়িয়েছে। তবে কয়েকদিন ধরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে আলুর দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে।

জাতীয় কৃষক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানি বলেন, মৌসুমের শুরুতে আলু ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন কৃষকরা। সেই আলু চার মাসে কয়েক হাত ঘুরে সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ছে। আর সিন্ডিকেট চক্রই বেশি মুনাফার আশায় দাম বাড়িয়ে ক্রেতার পকেট কাটছে। দেরিতে হলেও সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে মনিটরিং করছে। আমরা চাই সকল পণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান অব্যাহত থাকুক।

রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বলেন, শনিবার থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি শুরু হয়েছে। পর্যায়েক্রমে সবগুলো বাজারেই হবে। কেউ সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে বিক্রি করতে পারবে না। এটা আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সবগুলোকে বাজারে একযোগে ৩৬ টাকা কেজিতেই আলু বিক্রি হবে।

সরকার আলুর দাম বেঁধে দেয়ার পরই সিন্ডিকেট ভাঙতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে ভোক্তা অধিদফতর। চলতি মাসে আলুর অবৈধ মজুদসহ বাজার নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু তারপরও কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমছে না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক আজহারুল ইসলাম জানান, সরকারের বেঁধে দেয়া দাম নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছি আমরা। রংপুরের হিমাগারগুলোতে মজুমদারের সতর্ক করে আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

এদিকে বাজার স্থিতিশীল না হলে কঠোর হবার পাশাপাশি ডিমের মতো আলুও আমদানি করার কথা জানিয়েছেন ভোক্তার মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান। গত বুধবার রংপুরে অবৈধ মজুতদারের সিন্ডিকেট ভাঙতে হিমাগার অভিযানে গিয়ে এ হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ভোক্তার ডিজি বলেছেন, আমরা কোল্ড স্টোরেজে আলুর দর ২৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছি। এরপরও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজের কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট করে আলুর বাজার অস্থির করে তুলেছেন। আমরা এসব সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা করছি। আরও ৩-৪ দিন দেখব। এরমধ্যে বাজার স্থিতিশীল না হলে ডিমের মতো আলুও আমদানির জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা হবে।

দেশের বাজারে এখনও দুই মাসের আলু মজুত আছে। অথচ হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীদের যৌথ সিন্ডিকেট আলুর বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। সফিকুজ্জামান বলেন, নিজেদের এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দেওয়া কিছু ব্যক্তির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যারা কৃষকদের ঋণ দিয়ে স্বল্পমূল্যে আলু এনে হিমাগারে রেখে মুনাফা লুটছে।

শেয়ার করুন

আরো
© All rights reserved © arabbanglatv

Developer Design Host BD